অভি পাল
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক যেন রক্তস্নাত এক নীরব কসাইখানা। প্রতিদিন এখানে ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ, নিভে যাচ্ছে হাসি, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে কত শত পরিবারের স্বপ্ন। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়া মানুষগুলো আর ফিরে আসে না। কেউ ফিরে আসে লাশ হয়ে, কেউ বা বিকৃত দেহে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরায়। মায়ের কোল খালি হয়, বাবার বৃদ্ধ চোখ ফাঁকা হয়ে যায়, শিশুরা অনাথ হয়ে পড়ে। অথচ, এই নিদারুণ বাস্তবতা যেন কারও চোখে পড়ে না।
এই সড়কে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়—একটি পরিবার চিরদিনের জন্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পিতার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছেলেটি কাঁদছে, বোঝার ক্ষমতা নেই, বাবাকে আর কোনো দিন দেখতে পাবে না। নববিবাহিতা স্ত্রী বিধবা হয়ে পড়েছে, তার কপালের সিঁদুর শুকিয়ে গেছে। মায়ের লাশের পাশে বসে ছোট্ট মেয়েটি বিলাপ করছে, ‘মা, উঠো, আমাকে ফেলে কোথায় গেলে?’—এই কান্না কি প্রশাসনের কানে পৌঁছায়? নাকি তারা কেবল কাগজ-কলমে পরিসংখ্যান হিসেব করে দায় সারে?
এই সড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু দুর্ঘটনা সত্যিই বিভীষিকাময়। ২ এপ্রিল লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় একটি বাস ও দুটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০ জনের নির্মম মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে আরও ২ জন। তাদের কেউ হয়তো অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল, কেউ হয়তো পরিবারের সাথে আনন্দভ্রমণে বের হয়েছিল। কিন্তু তাদের আর ফেরা হলো না। ১৩ মার্চ দোহাজারীতে ঘটে আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যেখানে ভাই-বোনসহ তিনজনের প্রাণ ঝরে যায়।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পরপরই স্বজনহারাদের হৃদয়বিদারক আহাজারি, চোখের পানি আর শোকে স্তব্ধ পরিবেশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই এক অদৃশ্য ঝুঁকির মধ্যে আছি। আজ যারা লাশ হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে, কাল হয়তো আমরা নিজেরাই পড়ে থাকব। এই সড়ক যেন এক মৃত্যুর ফাঁদ, যেখানে প্রতিদিনই নতুন কোনো নাম যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।
এই মহাসড়ককে নিরাপদ করার জন্য এতদিনেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রাস্তাটি সরু, খানাখন্দে ভরা, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, অব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে এটি এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরকার ও প্রশাসনের কাছে সাধারণ জনগণের প্রশ্ন—আর কত লাশের স্তুপ হলে, কত মায়ের বুক খালি হলে, কত শিশু চিরদিনের জন্য বাবাকে হারালে এই নীরবতা ভাঙবে?
সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—এই মহাসড়ক দ্রুত ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্পিড ব্রেকার, ট্রাফিক সিগন্যাল ও সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। এই মৃত্যুপুরীকে নিরাপদ সড়কে পরিণত করা সরকারের দায়িত্ব।
আমরা কি প্রতিদিন এই লাশের সারি দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাব? নাকি এখনই আওয়াজ তুলব? চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না করে, কোনো শিশুর শৈশব নিঃসঙ্গ না করে—এটাই আমাদের একমাত্র দাবি।